যেভাবে শরীরের অতিরিক্ত ওজন/ফ্যাট ঝরিয়ে স্লীম হয়ে উঠবেন- মাহবুব হাসান

 
mahabub-hasan

অনেক শীর্ণকায় মানুষের কাছে স্থুলতা আরাধ্য হলেও যারা একটু মোটা এবং সাথে যদি প্রমাণ সাইজ ভুড়ি থাকে তাহলে শুধু সে ব্যক্তিটিই বুঝেন এর আসল মর্ম!

উঠতে-বসতে সমস্যা, প্যান্ট-মোজা পরতে সমস্যা, গিন্নির সাথে আদর-সোহাগ করতে সমস্যা, দৌড়াতে সমস্যা… আরো কত ধরনের সমস্যা যে পোহাতে হয় তার ইয়ত্তা নেই!

 

আমিও বাড়তি ওজন নিয়ে ভুগছিলাম গত ক’মাস ধরে। ৩মাসে কোমর ৩৫” থেকে ৩২” চলে এসেছে। ওজন ৭৪ থেকে ৬৮ এ।

 

আগেই বলে রাখা ভাল, আমি ডায়েট বা ওয়ার্কআউট এক্সপার্ট নই।

আমি যে ডায়েট এবং ওয়ার্কআউট প্লান ফলো করেছি, তাতে সুফল পেয়েছি তাই সবার সাথে শেয়ার করার জন্যই পোস্ট টি লিখতে বসা।

আমি ধরে নিচ্ছি আপনার টার্গেট শরীর থেকে বাড়তি ওজন/ফ্যাট ঝরানো এবং আপনি জীমে যান না।

ফ্যাট কি-কেন হয়, বিএমআই কি… আমি এ ধরনের কোন তাত্বিক আলোচনায় যাব না।

কারন এসব গুরুগম্ভীর তাত্বিক আলোচনার চেয়ে ব্যবহারিক দিকটাই আপনার বেশি কাজে দেবে এখন।

তবে পোস্টের প্রয়োজনে কিছু কিছু বিষয় নিয়ে আমাদের আলোচনার প্রয়োজন আছে।

 

প্রথমেই আমাদের শরীর এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ে কিছু প্যাঁচাল পাড়া যাক।

আমরা প্রতিদিন যে খাবার গুলো খেয়ে থাকি তার মূল উপাদান ৬টি- প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, খনিজ পদার্থ, ভিটামিন ও পানি। এই উপাদানগুলোর সমন্বয়ে তৈরি হয় দেহের চালিকাশক্তি- ক্যালরি।

এখন আপনি প্রতিদিন কত ক্যালরি গ্রহন করেন সেটা জানার আগে আসুন জেনে নেই আমাদের শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম চালানোর জন্য বা সুস্থ্যভাবে বেঁচে থাকার জন্য কতটুকু ক্যালরির প্রয়োজন।

 

যে ব্যক্তি সারাদিন অফিসে বসে কাজ করেন আর যিনি সারাদিন দৌড়ের উপর থাকেন, (এখানে দৌড়ের উপরে থাকা বলতে মার্কেটিং টাইপ জবের কথা বুঝিয়েছি) তাদের দুজনের ক্যালরির চাহিদা বা বার্ন করার পরিমাণ নিশ্চয়ই সমান হবেনা। স্বাভাবিক নিয়মেই যিনি বেশি পরিশ্রম করেন তার বেশি ক্যালরির প্রয়োজন।

যদি কোন কায়িক পরিশ্রম না করে সারাদিন কেবল শুয়ে-বসে কাটিয়ে দেই, তাহলেও আমাদের প্রায় ১৭০০ থেকে ২২০০ কিলোক্যালোরী পরিমান শক্তি খরচ হবে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য।

 

প্রশ্ন করতে পারেন-যদি একদিন খাবার না খাই অর্থাৎ ক্যালরি গ্রহন না করি সেক্ষেত্রে কি হবে!

এখানেও কিছু ফানি ফ্যাক্টস আছে।

কুনোব্যাঙ যেমন বছরে ৬-৮মাস খেয়ে-খেয়ে শরীরে অতিরিক্ত ফ্যাট জমায়, শীতকালে আর ওদের খাবার গ্রহনের প্রয়োজন হয়না, কারন দেহের সঞ্চিত ফ্যাট থেকে ওরা ক্যালরি পায়। এভাবেই ওরা পুরো শীতকাল টা কাটিয়ে দেয়। শুধু কুনোব্যাঙ নয়, এমন আরো অনেক প্রাণীই আছে।

 

আপনি যদি একদিন খাবার বা ক্যালরি গ্রহন না করেন তারপর ও আপনার বেঁচে থাকার জন্য ১৭০০-২২০০ কিলোক্যালোরী প্রয়োজন। এখন আপনার সিস্টেম কোথায় পাবে এই ক্যালরি?

 

ইউনিভার্সাল কনভার্টার হিসাবে ফরম্যাট ফ্যাক্টরীর তুলনা নেই! অডিও-ভিডিও-ইমেজ-ডকুমেন্ট সহ কনভার্সনের জন্য প্রায় সব রকম টুল এতে পাবেন।

আপনার স্টম্যাক বা পাকস্থলীও তেমনি একটি ইউনিভার্সাল কনভার্টার!

অনেকের ধারণা আছে, আমি যদি ফ্যাটি খাবার না খেয়ে শাক-সবজী-মাছ এই জাতীয় খাবার পেট ভরেও খাই ওজন বাড়বেনা বা মোটা হব না কারন আমি তো ফ্যাটি কিছুই খাচ্ছিনা।

সম্পুর্ন ভুল ধারণা!

আপনার শরীরের জন্য যতটুকু ক্যালরি প্রয়োজন তার অতিরিক্ত যখনই খাবেন, আপনার স্টম্যাক সেটাকে ভবিষ্যতে কাজে লাগানোর জন্য ফ্যাটে কনভার্ট করে ফেলবে,

বাকিটুকু বর্জ্র হিসাবে বের করে দেবে।

যখন আপনি ক্যালরি গ্রহন করবেন না বা খাবেন না, আপনার শরীরের ফ্যাটকে আপনার সিস্টেম আবার ক্যালরি তে কনভার্ট করে ফেলবে!

বুঝতেই পারছেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ করা মানেই বাড়তি ফ্যাট,

ফলাফল=দর্শনীয় একখান ভুঁড়ি! তাই ক্যালরি গ্রহণ-পোড়ানোর মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলেই বিপদ।

 

এবার আসুন দেখি, জীমের এক্সারসাইজ/বাসার ট্রেডমিলে দৌড় বা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে আপনাকে অন্যান্য যেসব কায়িক পরিশ্রম করতে হয় তাতে কত কিলোক্যালোরীর প্রয়োজন।

দুলকিচালে ৩০মিনিট দৌড়ালে আপনি প্রায় ৩৫০কিলোক্যালোরী বার্ণ করতে পারবেন যেটা জীমে দু’ঘন্টা এক্সারসাইজ করেও করতে পারবেন না।

কারন জীমে আপনি একটানা ওয়ার্কআউট করছেন না, মাঝে মাঝে বিশ্রাম ও নিতে হচ্ছে আপনাকে। কিন্তু দৌড়ালে আপনার ফ্যাট বার্ণ হয় নিরবিচ্ছিন্নভাবে, পালস আকারে।

সেজন্য আপনার ক্যালরি বার্ণ ও হয় বেশি।

নিচের চার্ট টা একটু খেয়াল করে দেখলেই পরিস্কার বুঝতে পারবেন।

 

 

 

এখন বিবাহিতদের জন্য মজার কিছু তথ্য দেই। অবিবাহিতরা কিছুক্ষনের জন্য দূরে মুড়ি খান!

বিভিন্ন ওয়ার্কআউট রিসার্চে দেখা গেছে-একঘন্টার সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ কিলোক্যালোরী বার্ণ হয়! ওয়েট! এক্ষুনি বেডরুমের দিকে দৌড় দিয়েন না! 😛

সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্সের মাধ্যমে আপনি কত কিলোক্যালোরী বার্ণ করতে পারবেন সেটা আপনার এইজ, ওয়েট, ইন্টেনসিটি লেভেল, ফোরপ্লে সহ আরো বেশ কিছু বিষয়ের উপর ডিপেন্ড করে।

মজার ব্যাপার হল, ইন্টারকোর্সের সময় ক্যালরি বার্ণ তো হয়ই উপরন্তু ২০মিনিটের এ্যাভারেজ ফোরপ্লে তেও প্রায় ১৫০ কিলোক্যালোরী বার্ণ হয়!

 

কি কপাল বিবাহিতদের! 🙁

তবে এ বিষয়ে এই পোস্টে আর বেশি ডিটেইলে যাচ্ছিনা। যদি আমার পাঠকদের মধ্যে বিবাহিতদের সংখ্যা বেশি হয় পরবর্তীতে এটার উপরে বিশদ পোস্ট দেবার ইচ্ছে আছে!

 

এক্সারসাইজঃ দৌড়

 

* নিয়ম করে প্রতিদিন সকালে অথবা বিকালে যখন ই সময় পান, দৌড়াবেন।

দৌড় হচ্ছে ইউনিভার্সাল এক্সারসাইজ। দৌড়ানোর সময় শরীরের বড় মাসলগুলো সহ অন্যান্য ছোট মাসলগুলোর ও ব্যায়াম হয়।

 

*যদি সকালে দৌড়ান তবে দৌড়ানোর আধা ঘন্টা আগে লেবু এবং মধু একসাথে মিশিয়ে শরবত তৈরি করে খেতে পারেন। লেবু-মধুর দ্রবণ টা কিভাবে তৈরি করবেন বলিঃ

এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে চা চামচের আধা চামচ লেবুর রস এবং এক চামচ মধু একসাথে মিশাবেন। ঠান্ডা পানিতে মিশালে উলটো ফল হবে অর্থাৎ ওজন বাড়বে।

লেবুর এসিড দাতের এনামেলের জন্য ক্ষতিকর, তাই শরবত খাবার পরে কুলি অথবা ব্রাশ করে ফেলতে পারেন।

দৌড় শেষ করে এসে দেখবেন পেট একদম কিলিয়ার! বদ হজম, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা সহ পরিপাকতন্ত্রের অনেকগুলো ছোটখাট রোগ আপনার হবেনা। আর যদি বিকালে দৌড়ান, তাহলে দৌড়ানোর কমপক্ষে দু’ঘন্টা আগে খেয়ে নিবেন। ভরা পেট নিয়ে দৌড়াবেন না।

 

*দৌড়ানোর সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নিবেন না। নাক দিয়ে শ্বাস নিবেন-ছাড়বেন, তাহলে দম ধরে রাখতে পারবেন।

 

*প্রথমেই উসাইন বোল্টের মত খিঁচে দৌড়াবেন না। ওটা করলে আপনার নেতিয়ে পড়তে সময় লাগবেনা এবং খুব একটা কাজে আসবেনা। অনেকের ধারণা জোরে দৌড়ালেই ফ্যাট বেশি বার্ণ হয়। ব্যাপার টা তা নয়।

ঘোড়ার মত রেস দেবার দরকার নেই, দুলকিচালে অর্থাৎ রিল্যাক্সে দৌড় শুরু করুন। এমন একটা স্পীড বেছে নিন যেটা অনেকক্ষন ধরে কন্টিনিউ করতে পারবেন।

 

*ওয়ার্কআউটের জন্য ইন্টারনেটে অনেক প্লে লিস্ট পাবেন, নিজের রুচিমত ডাউনলোড করে দৌড়ানোর সময় শুনতে পারেন। তাহলে একটা রিদম পাবেন।

 

*দৌড়ানোর সময় কথা বলবেন না। এতে আপনার রিদম এবং এনার্জী দুটোই তাল হারিয়ে ফেলবে। দৌড়ানোর সময় মুখে চুইংগাম/চকলেট রাখতে পারেন। চুষবেন না বা গিলবেন না। এতে বারবার পানি খাওয়ার জন্য গলা শুকিয়ে কাঠ হবেনা।

 

*প্রথম দিন যদি ১০মিনিট দৌড়ান তাহলে দু’তিন দিন পর ২/৩মিনিট করে সময় বাড়িয়ে দিবেন। এভাবে দু’তিন দিন অন্তর পর্যায়ক্রমে সময় বাড়াতে হবে।

 

এবার আসি খাদ্যাভ্যাসের কথায়ঃ

 

* সকালে ভাত খাওয়ার অভ্যাস থাকলে বাদ দিন কয়েক মাসের জন্য। ভাতের পরিবর্তে ২পিস রুটি/সবজী দিয়ে নাস্তা করতে পারেন। উহু! রুটির সাথে ডিম/আলু ভাজীর কথা একদম ভুলে যান!

 

* দুপুরে যতটুকু খেয়েছিলেন, রাতে তার থেকে কম খাবেন যেহেতু রাতে আমাদের কোন শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়না (বিবাহিত হলে আলাদা কথা!)

এবং অবশ্যই ঘুমাতে যাবার কমপক্ষে তিনঘন্টা আগে খাবেন।

রাতের খাবার খাওয়ার কিছুক্ষন পরেই যারা ঘুমাতে চলে যান, এদের মুটিয়ে যাবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।

 

* আলু যত পারেন কম খাবেন, সে আলু ভর্তা হোক বা সবজীতে হোক।

খাওয়ার সময় ভাত নিবেন কম, এবং সবজী/তরকারী নিবেন বেশি করে। ভাত আপনার শরীরের জন্য উপকারে আসেনা।

সবজীতে তেল যত কম দিয়ে রান্না করতে পারেন আপনার জন্য তত ভাল, সেদ্ধ রান্না হলে আরো ভাল। সবজী/তরকারী শুকনা শুকনা না রেখে হালকা ঝোল রাখবেন।

 

* তেলে ভাজা জিনিস পুরোপুরি এড়িয়ে চলবেন। আজ্ঞে! ঠিকই ধরেছেন! আপনার লোলুপ জ্বিহ্বাটা চিকেন ফ্রাই, বার্গার, সর্মা সহ যাবতীয় ফাস্টফুডের জন্য লকলক করলেও মাস খানেকের জন্য সম্পুর্ন ভুলে যেতে হবে। 😉

 

* মিষ্টি, মিষ্টি জাতীয় যত আইটেম, গরু-খাসির মাংস, সফট/কোল্ড ড্রিংক্স সহ যত রকমের ফ্যাটি এবং জাঙ্ক ফুড আছে, মাস খানেকের জন্য এগুলোর কথা ভুলে যান! পরবর্তীতে অল্প-স্বল্প খেতে পারবেন কিন্তু এখন থেকে অফ।

 

* খাবারে কাচা লবন খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন। রান্না করার সময়ই আপনার প্রয়োজন অনুসারে লবণ দিয়ে নিন।

 

* দুধ খাওয়ার অভ্যাস থাকলে খুবই ভাল, তবে অবশ্যই দুধের সর এবং ঘন দুধ খাবেন না! সবচেয়ে ভাল হয় দুধে পানি একটু বেশি দিয়ে পাতলা করে জ্বালাতে পারলে। এতে দুধ দ্রুত হজম হবে।

 

*সপ্তাহে একদিন ওজন এবং শরীরের মাপ নিন।

 

নিচে আপনাদের জন্য একটি ক্যালরি চার্ট দিয়ে দিলাম। কোন খাবারে কত ক্যালরি থাকে সে সম্পর্কে ধারণা পাবেন এতে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যালরির যোগান দিতে সুবিধা হবে আপনার।

 

0202

 

 

তাগাদার কারনে অনেক তাড়াহুড়োর মধ্যে লিখতে হয়েছে। যে কারনে হয়ত আরো বেশকিছ পয়েন্ট বাদ পড়ে যেতে পারে। মনে পড়লে পরে এ্যাড করে দিব।

 

আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভাল থাকুন।

Leave a Reply